এরিয়া ৫১ এর রহস্যভেদ


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শহর লাস ভেগাস বা নেভাদা অঙ্গরাজ্যের কথা কমবেশি আমরা কমবেশি সবাই শুনে থাকবো। বৃহত এই শহরের লাল নীল উজ্জ্বল আলো মুগ্ধ করার মতো।  শহুরে মুগ্ধতার বাইরেও  অন্য যে আরেকটি বিষয় আকৃষ্ট করে তা হচ্ছে এখানকার মরূভূমির অন্ধকার রহস্যময়তা! মাইলের পর মাইল, যেদিকেই চোখ যাবে দেখতে পাবেন শুধুই ফাঁকা রাস্তা এবং বিস্তৃত খামার। নেভাদার বেশিরভাগ অংশ জুড়েই, শুধু ধুলা-বালি ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। 

কিন্তু আসলে চোখ আমাদের যা দেখায় বাস্তবে সবসময় সেটা নাও হতে পারে। এই অঞ্চলটির ক্ষেত্রেও ঠিক সেরকমটাই বলা চলে। সুবিশাল মরুভূমির প্রান্তর দেখে আপনার মনেই হবে না যে এখানেও কোন রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে। নেভাদা মরুভূমির বুক চিরে একটি রাস্তা এগিয়ে গেছে যেটা আপনাকে একসময় গ্রুম লেক নামক স্থানে নিয়ে যাবে।   সেখানে পৌছানোর ঠিক আগ মূহুর্তেই দেখতে পাবেন একটি ওয়ার্নিং সাইন। এই সাইনটি দ্বারা তারা আপনাকে এটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে, আপনার- এই রাস্তা দিয়ে যতদূর যাওয়া সম্ভব আপনি তা অতিক্রম করে ফেলেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, কি আছে এই ওয়ার্নিং সাইনবোর্ড এর পেছনে? একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন- নজরদারি ক্যামেরা, সিকিউরিটি গার্ড, এবং আরো কয়েক মাইলের মতো রাস্তা। বুঝতেই পারছেন যে, কিসের কথা বলছিলাম। হ্যা, এরিয়া ৫১। 

৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, আমেরিকার অন্য কোন জায়গা এরিয়া ৫১ এর মতো এতোটা চর্চিত এবং এতোটা রহস্যময় ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই সবার মনে প্রশ্ন জাগে যে, এরিয়া ৫১ এর কি সত্যিই কোন অস্তিত্ব আছে? এটা কি কোন গোপন সামরিক ঘাটি? নাকি এখানে এলিয়েনদের প্রযুক্তি ও মহাকাশযান নিয়ে গবেষণা করা হয়?

যদি এরিয়া ৫১ এর অস্তিত্বের কথা বলি তাহলে একবাক্যে বলবো, বাস্তবে এরিয়া ৫১ এর অস্তিত্ব অবশ্যই আছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, এটি একটি গোপন সামরিক বিমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আজো পুরো দমে একটি সামরিক ঘাটি হিসেবেই সক্রিয় আছে। বহু কন্সপিরেসি থিওরিস্টরা বলে থাকেন, এখানে এলিয়েন কিংবা UFO নিয়েও সরাসরি গবেষনা হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক শহুরে উপকথা অনুসারে, এরিয়া ৫১ এর সাথে এলিয়েন কিংবা UFO এর কোন যোগশাযোশ নেই। 

তবুও, মানুষ কেন এটা বিশ্বাস করতে শুরু করলো  যে এখানে ভীনগ্রহীদের নিয়ে গবেষণা হয়? ১৯৫৫ সালের দিকে নেভাদা “টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জ কমপ্লেক্সের” অংশ হিসেবে এরিয়া ৫১ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। এটি গ্রুম লেক নামক একটি হ্রদ এবং পর্বত দ্বারা বেষ্টিত একটি উপত্যকার পাশে নির্মিত হয়েছিল যেখানে সর্বসাধারন সহজে প্রবেশ করতে পারতো না। তখন এই বিশাল শুকনো লবন সমভূমির লেকটিকে বিমানের রানওয়ে হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত বলে মনে হওয়ায় এখানে বিমান ওঠানামা করতো। 

এরিয়া ৫১ তৈরি করা হয়েছিল মূলত একটি “শীর্ষ গোপন এয়ারক্রাফট” এর টেস্ট ফেসিলিটির জন্য। আর এই টেস্ট ফেসিলিটির রেজাল্ট হিসেবে আমরা  u-2 স্পাই প্লেনকে চোখের সামনে দেখতে পাই।  যেটা দিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা গুপ্তচর অভিযান চালিয়ে থাকে। এটি ৬০ হাজার ফুট বা তারচেয়ে বেশি উচ্চতায় বিশেষ গুপ্তচর অভিযান চালাতে সক্ষম ছিল। যা তখনকার অন্যান্য বিমানের তুলনায় অনেক বেশি । সেসময়কার বিমানগুলো সাধারণত ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে পারতো।

কিন্তু রহস্যময় এরিয়া ৫১ এর বদৌলতে, মানুষ শীঘ্রই U-2 স্পাই প্লেনকে আকাশ পথের সর্বোচ্চ উচ্চতায় দেখতে শুরু করে। তবে এই স্পাই প্লেন কে ঘিরে বাণিজ্যিক এবং সামরিক পাইলট সহ অনেকেই ধাঁধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।  কারন, বিমান ইঞ্জিনিয়ারিং এর সকল বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত গোপনীয়, এবং জনসম্মুখের বাইরে। যারা দূর থেকে বিমানটি দেখতে পেতেন, বিমানের এতো উচ্চতা দিয়ে উড়তে পারার ক্ষমতা এবং বিচিত্র ডিজাইনের কারনে তারা সন্দেহ করতেন যে এটি অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছে!

আর এভাবেই এরিয়া ৫১ কে ঘিরে ইউএফও এবং এলিয়েন মিথ গড়ে ওঠে। এবং এই মিথকে বিশ্বাস করানোর মতো অনেক উপযুক্ত সূত্রও খুজে পায় তারা। অনেক বানিজ্যিক ও সামরিক পাইলটদের কাছ থেকে এরিয়া ৫১ সম্পর্কে লোমহর্ষক কিছু তথ্য পাওয়া যায় যা এরিয়া ৫১ এর মিথকে আরো সতেজ করে তোলে। এ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সমালোচিত হিসেবে ধরা হয় বব লাজার নামের এক ব্যক্তির স্বীকারোক্তিকে। ১৯৮৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে এরিয়া ৫১ এর নিকটতম ফ্যাসিলিটি এস-৪ এ কর্মরত থাকার দাবি করেন। তিনি আরও বলেন,সেখানে তিনি এলিয়েন টেকনোলজির রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করতেন এবং বিভিন্ন ধরনের এলিয়েন মহাকাশযানের প্রত্যক্ষদর্শী। এমনকি সেগুলো কিভাবে কাজ করত তার বিস্তারিত প্রক্রিয়াও তিনি ব্যাখ্যা করেন। এরকম আরো বহু স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় এরিয়া ৫১ সম্পর্কে যা পরবর্তী এলিয়েন ও ufo মিথকে আরো শক্তিশালী করে। অনেকে তো এটাও বলে থাকেন চাদের অবতরণ নাকি স্রেফ একটা সাজানো ঘটনা যেটা এরিয়া 51 এর ভেতরে চিত্রায়িত করা হয়েছে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই মানুষগুলো কিসের স্বার্থে এসব মিথ্যে গল্প তৈরি করবে? আবার দেখুন, সরকার এসব কন্সপিরেসিকে নিরুৎসাহিত না করে একরকম মজা ওড়াচ্ছে। এরিয়া ৫১ এ আসলে বাস্তবে যা চলছিল তার চেয়ে এলিয়েন এবং ufo মিথে জনসাধারনের বিশ্বাসকে সরকার সায় দিয়ে যাচ্ছে।  

আর এসব কন্সপিরেসির ওপর নির্ভর করে, এরিয়া ৫১ এর পাশেই একটি পর্যটন বানিজ্য এলাকা গড়ে উঠেছে।  এমনকি সেখানকার হাইওয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে Extraterrestrial Highway নামে। ইউএফও এবং এলিয়েনে আগ্রহী মানুষেরা নিয়মিত এই Highway দিয়ে ড্রাইভ করে থাকেন এই আশায় যে, যদি আকাশে UFO বা কোন মহাকাশযানের দেখা পাওয়া যায়।  

কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত, তারা কখনোই এলিয়েন বা ইউএফওর দেখা পায় না। এর বদলে হয়ত এরিয়া 51 এ এক্সপেরিমেন্টরত অবস্থায় কিছু সাধারণ বিমানের দেখা পেতে পারেন। U-2 স্পাই প্লেনের পর সেখানে আরো বেশ কিছু এয়ারক্রাফটের পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে A-12 “Blackbird,” F-117 Stealth Fighter, এবং B-2 Stealth Bomber।

এরিয়া ৫১ এ বর্তমানে কি হচ্ছে? কে জানে! আপাতপক্ষে এটি এখনো টপ সিক্রেট টেস্টিং ফেসিলিটি হিসেবেই রয়ে গেছে। মার্কিন সরকার জনসাধারণকে কখনোই এর কাছাকাছি কোথাও ঘেষতে দেয় না। আপনি যদি এরিয়া ৫১ এর খুব কাছেও যেতে চান তাহলেও সেটা হবে ১৫ মাইল দূর থেকে। আকাশসীমায় ৫৭৫ মাইল পর্যন্ত সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে যাতে এর ওপর দিয়ে কোন বিমান বা উড়োজাহাজ উড্ডয়ন করতে না পারে। 

লাস ভেগাসের উত্তরে ৫,২০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে নেভাদা টেস্ট অ্যান্ড ট্রেনিং রেঞ্জ বিস্তৃত। এই সীমানার মধ্যে, ১৬০০ বর্গমাইল জুড়ে নেভাদা টেস্ট সাইট রয়েছে। পারমাণবিক বোমা পরীক্ষণের কারনে রেডিয়েশন দ্বারা এই অঞ্চলের বেশ কিছু অংশ সবসময় দূষিত হয়ে থাকে। 

এরিয়া 51 এর নামকরন করা হয় “নেভাদা টেস্ট সাইটের” পুরানো মানচিত্র থেকে। তারা গ্রুম লেকের আশেপাশের এলাকাটিকে  এরিয়া ৫১ হিসেবে নির্ধারিত করেছিল।  যখন U-2 স্পাই প্লেন প্রকল্প শুরু হয়, তখন এলাকাটিকে প্যারাডাইস রাঞ্চ বলা হতো। আর এখন, এরিয়া ৫১ কে ন্যাশনাল ক্লাসিফাইড টেস্ট ফ্যাসিলিটি নামে ডাকা হয়। 

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০১৩ সালে মার্কিন সরকার এরিয়া ৫১ এর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু, এর ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে আগ্রহী নয় তারা। তাই কন্সপিরেসি থিওরীগুলো এখনো ঠিক আগের মতোই পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরিয়া ৫১ সম্পর্কে আপনার কি ভাবনা? এটা  কি শুধুই একটা সামরিক ঘাটি? ভীনগ্রহের প্রাণীর সাথে আদৌ কি এর কোন সম্পর্ক থাকতে পারে? আসলে এরিয়া ৫১ সম্পর্কে আমেরিকা সরকার অনেক তথ্যই লুকিয়ে রেখেছে। তাই মানুষের মনে এলিয়েন কিংবা UFO এর সাথে এর সম্পৃক্ততার বিষয়ে সন্দেহ দানা বাধাটা অসম্ভব কিছু নয়। আর বাস্তবে সেটাই হচ্ছে।


Source:

  • https://www.nationalgeographic.com/news/2013/8/130816-area-51-space-ufos-nevada-cia-declassified/
  • http://science.howstuffworks.com/space/aliens-ufos/area-51.htm
  • https://www.britannica.com/place/Area-51

আর্কাইভ

যোগাযোগ ফর্ম

প্রেরণ